শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৩ পূর্বাহ্ন
।। মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন, কালের খবর।।
নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ সাধারণত জনগণের মনে আশার সঞ্চার করে। কিন্তু ২০২৫ সালের এই সময়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে যে বাস্তবতা উপস্থিত, তা আশাবাদের চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীলতা, আত্মসংযম ও দূরদর্শিতার দাবি রাখে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার অভিঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের ভেতরের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও নীতিগত শিথিলতা। ফলে দেশের অর্থনীতি আজ এক গভীর সংকটকালে উপনীত। একদিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা, অন্যদিকে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ অনিয়ম—এই দ্বিমুখী চাপ নতুন সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। এই বাস্তবতায় জনপ্রিয়তা রক্ষার ক্ষণস্থায়ী রাজনীতি পরিহার করে কঠোর অথচ প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারে হাত দেওয়াই সময়ের অনিবার্য দাবি।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। আর এই অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে নির্মম আঘাত এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছায়, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে ২০২৫ সালের শেষভাগে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য এখনো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য চরম চাপের কারণ। আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। ফলে মানুষ বাধ্য হচ্ছে সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এক ভয়ংকর বার্তা বহন করে।এই পরিস্থিতিতে বাজার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ও কঠোর ভূমিকা ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। গুটিকয়েক প্রভাবশালী আমদানিকারক, মজুতদার ও মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে বাজার ছেড়ে দিলে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। টিসিবির কার্যক্রম জোরদার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
বৈদেশিক মুদ্রা সংকট ও বিনিময় হারের ক্ষেত্রে-বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে নীরবে ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে। ডলার সংকটে শিল্পকারখানায় কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, উৎপাদন কমছে এবং কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সরকারি হিসাবে মোট রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি দেখালেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিট রিজার্ভের অবস্থান উদ্বেগজনক, যা আমদানি সক্ষমতা ও বৈদেশিক দায় পরিশোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ডলারের বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার নীতি দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত ব্যর্থ। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে বাজার বাস্তবতাকে অস্বীকার করার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার কালোবাজার আরও শক্তিশালী হয়েছে। নতুন সরকারকে ধাপে ধাপে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে। একই সঙ্গে রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে কৃষিপণ্য, চামড়া, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ২০২৪ সালে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্থনীতির জন্য স্বস্তির খবর হলেও হুন্ডি দমন করে এই অর্থকে বৈধ চ্যানেলে ধরে রাখা সরকারের দায়িত্ব।
দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। এই বিপুল অঙ্ক কেবল আর্থিক ব্যর্থতার চিত্র নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রশ্রয়, সুশাসনের অভাব ও নৈতিক অবক্ষয়ের নগ্ন প্রতিফলন।
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে না। পুনঃতফসিল ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে সাধারণ আমানতকারীর আস্থা ফেরানো অসম্ভব। একই সঙ্গে দুর্বল ও অকার্যকর ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও পেশাদার। সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকৃত অর্থে স্বায়ত্তশাসন দিতে না পারলে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কেবল কাগুজে আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
রাজস্ব আয় ও কর সংস্কারের ক্ষেত্রে-বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন, যা রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে রেখেছে। এই দুর্বল রাজস্ব ভিত্তি নিয়ে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। কর সংস্কারের নামে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো কোনো সমাধান নয়। বরং যারা কর দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন অথচ কর ফাঁকি দিচ্ছেন, তাদের করজালের আওতায় আনাই ন্যায্য পথ। এনবিআরের দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ কর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারলে কর সংস্কার কখনোই কার্যকর হবে না।
জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও জনগণ কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবা পাচ্ছে না। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। জ্বালানি মূল্যে স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ না করলে ভর্তুকির চাপ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দেবে।
দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। কিন্তু পরিকল্পিত কর্মসংস্থান ও মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া এই জনশক্তি ভবিষ্যতে বোঝায় পরিণত হতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে ব্যবধান কমাতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহজ শর্তে ঋণ ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করলে উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
গত দশকে আমরা অনেক মেগা প্রজেক্ট দেখেছি। এখন সময় এসেছে অবকাঠামো থেকে উৎপাদনশীল খাতে মনোযোগ দেওয়ার।নতুন কোনো বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে তার অর্থনৈতিক রিটার্ন (RoI) নিখুঁতভাবে যাচাই করতে হবে। শুধু দৃশ্যমান উন্নয়ন নয়, বরং মানুষের আয় বাড়ে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে হবে।প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের পুরনো অসুখ। নতুন সরকারকে কঠোর তদারকির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে প্রজেক্ট শেষ করার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। সরকারি কেনাকাটা ও ই-টেন্ডারিং ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নিয়মিত জনসমক্ষে আনার বিধান কার্যকর করা জরুরি।
দুর্নীতি ও অর্থপাচার দেশের অর্থনীতির নীরব ঘাতক। দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে কার্যকর করা ছাড়া এই ক্ষয় রোধ সম্ভব নয়। বড় আর্থিক অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
অর্থনৈতিক সংস্কারের সময় সাময়িকভাবে কিছু মানুষের কষ্ট বাড়তে পারে। সেই আঘাত সইবার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে আরও সুসংহত করতে হবে।দুস্থ ও প্রকৃত দরিদ্ররা যাতে ভাতার টাকা পায়, তা নিশ্চিত করতে ডাটাবেজ আপডেট করতে হবে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য কার্ডের মাধ্যমে সুলভ মূল্যে রেশনের ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে চালু রাখা প্রয়োজন।
নতুন সরকারের সামনে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর গভীর সংকটের পাহাড়। তবে সংকটই সুযোগ তৈরি করে দেয়। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যে মাইলফলক আমাদের সামনে রয়েছে, তাকে অর্থবহ করতে হলে অর্থনীতির ভিত শক্ত করার বিকল্প নেই। আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর শর্ত পূরণ কেবল টাকা পাওয়ার জন্য নয়, বরং আমাদের নিজেদের অর্থনীতির স্বার্থেই প্রয়োজন।নতুন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা এবং আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্বই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগোবে না কি মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে পড়বে। একটি স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোই হতে পারে সাধারণ মানুষের ভোটের শ্রেষ্ঠ প্রতিদান। নতুন সরকারের কাছে জাতির প্রত্যাশা—তারা ক্ষমতার মোহে নয়, বরং অর্থনীতির কঠিন সত্যগুলো অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে হাঁটবেন।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
Email : msislam.sumon@gmail.com