শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০৯:৩৫ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
শিশু তুবা মায়ের বিয়ের খবর দেখে টেলিভিশনে। কালের খবর জুট কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। কালের খবর ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় গাড়ির চাকা থামে ঘোরে। কালের খবর সাংবাদিক মুজাক্কিরের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আলটিমেটাম। কালের খবর বাড়ছে উৎপাদন চায়ের বাজারে নতুন ‘সাদা সোনা’ ইউপি নির্বাচনে ইমানুজ্জামান পল্লবকে ‘নৌকা প্রতীক দিতে সলিমগঞ্জবাসীর উঠান বৈঠক। কালের খবর পাটুরিয়াঘাটে পরিবহণ ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য। কালের খবর ডেমরা ব্যাটারিচালিত নিষিদ্ধ অটোরিকশা ও ইজিবাইকের দৌড়াত্ম্য স্কুল মাঠ দখল করে ইউপি মেম্বারের বালু ব্যবসা। কালের খবর ইউএনও-র নির্দেশ উপেক্ষা আ’লীগ নেতার ফসলি জমিতে পুকুর খনন ও মাটি বিক্রি চলছে। কালের খবর
কাওরান বাজারে কিশোরী ও নারীদের প্রকাশ্যে ইয়াবা ও গাজা বিক্রি : নীরব আইনশ্খৃলা বাহিনী। কালের খবর

কাওরান বাজারে কিশোরী ও নারীদের প্রকাশ্যে ইয়াবা ও গাজা বিক্রি : নীরব আইনশ্খৃলা বাহিনী। কালের খবর

মোহাম্মদ ওমর ফারুক, কালের খবর :
বয়স পনেরো কি ষোলো। জরাজীর্ণ কাপড়। উষ্কখুষ্ক চুল। পায়ে ছিঁড়া স্যান্ডেল। পুরো দেহে দারিদ্র্যের ছাপ। এই বেশে কাউকে চোখে ইশারা দিচ্ছে আবার কাউকে ডাক দিচ্ছে। একটু এগিয়ে গেলেই জানতে চায় কতটি লাগবে? এই প্রতিবেদক পরিচয় গোপন করে- একটি লাগবে বলে জানান। পরে ওই কিশোরী তার জামার ভিতর পকেট থেকে দু’টি প্যাকেট বের করে দেয়।
জিজ্ঞাসা করে কোনটি নিবেন? ওই প্যাকেট দু’টিতে ছিল দুই ধরনের ত্রিশ-চল্লিশটি ইয়াবা। একটির দাম ৩৫০, আরেকটি ৪৫০ টাকা। কিশোরীর কাছে জানতে চাওয়া হয়- এই ইয়াবাগুলো কোথা থেকে নিয়ে আসা হয়? কার থেকে নিয়ে আসে? এমন প্রশ্নে সন্দেহ হলে কিশোরীটি দৌড়ে স্থান ত্যাগ করে। এই দৃশ্য কাওরান বাজার রেলগেট এলাকার। গত বুধবার বিকাল ৩টা। কাওরান বাজার রেলগেট থেকে এফডিসির পথ ধরে হাঁটা শুরু। এফডিসি রেলগেট পর্যন্ত যেতে সময় লাগে ঘড়ির কাঁটায় ৮ মিনিট। এই পুরো ৮ মিনিটে ১৮ জন খুচরা ইয়াবা বিক্রেতার ডাক পাওয়া যায়। যাদের সবার কাছেই ইয়াবা ছিল। এর মধ্যে ১০ জনই ছিল কিশোরী। বাকি ৮ জন নারী। এসব নারী ও কিশোরী শরীরের ঊর্ধ্বাংশে লুকিয়ে রাখে ইয়াবা ট্যাবলেট। আর কোমরের সঙ্গে বাঁধা কাপড়ের বিশেষ ব্যাগে রাখে কাগজে মোড়ানো গাঁজা। আর ঘরে রাখে ফেনসিডিল বা হেরোইন। তবে ক্রেতাদের চাহিদা বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট।
পরের দিন বৃহস্প্রতিবার বিকেল চারটা। একই জায়গায় একঘন্টা সময় পর্যবেক্ষন। উদ্দেশ্য কারা কিনতে আসতে এসব ইয়াবা। ওই এক ঘন্টায় দেখা যায়, প্রায় অর্ধশতাধিক তরুণের আনাগোনা। তাদের উদ্দেশ্য ইয়াবা। তাদের বেশীভাগ ক্রেতাদের আগে থেকেই চিনেন এসব বিক্রেতারা। তাই দামাদামি বা বেশী সময় নেন না। মাত্র মাদক কিনেছেন এমন একজনের সঙ্গে খাতির জমানোর চেষ্টা করেন এই প্রতিবেদক। ক্রেতা একজন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার সঙ্গে তার আরো দুই বন্ধু। তারা তিনজনই শুক্রাবাদ একটি বাসায় থাকেন। তাদের একজন বলেন , আমরা সপ্তাহে দুই তিন দিনই আসি। যখনই টাকা জোগাড় হয় তখনই আসা হয়। তারা তিনজনই পড়াশোনা পাশাপাশি ইংরেজী টিউশনি করান। তাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে সবাইকে আমরা চিনি। এখানকার বেশীরভাগই বাচ্চা মেয়ে। তারা নিয়মিত ইয়াবাসহ গাজাও বিক্রি করে । আমরা মূলত ইয়াবা নিয়ে থাকি। তবে এসে দ্রুত নিয়ে চলে যাই। এখানে বেশীক্ষণ থাকি না। দেখা গেছে যারা ইয়াবা বিক্রি করে,তাদের কেউ ধরে না। আমাদের হাতে দেখলে পুলিশ আমাদের ধরে নিয়ে যায়।আমাদের কাছে টাকা চায়। এরকম বহুবার হয়েছে। অনেক পুলিশও আমাদেরকে এখন চিনে।
এদিকে দেখা যায় বিকেলে আসা বেশীর ভাগ ক্রেতাই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়া তরুণ। তাদের ভাষ্যে এই এলাকায় কম দামে ভালো মানের ইয়াবা পাওয়া যায। পরের দিন শুক্রবার সকাল দশটা। সকালে আবার সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় একই দৃশ্য। তবে ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নতা। সকাল বেলায় মধ্যবয়সী পুরুষদের আনাগোণা বেশী দেখা যায়। তারা মূলত কাওরানের দিনমুজুর বা শ্রমিক।
তিনদিনের সরেজমিনে দেখা যায়,সকালের ক্রেতা সাধারণত ৩০-ঊর্ধ্ব ব্যক্তিরা আর বিকেলের ক্রেতা ছাত্র-যুবক। যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে। রাজধানীর কাওরান বাজার। সারাদেশের সবচেয়ে বড় পাইকারী মার্কেট হিসেবেই পরিচিত এই বাজারটি। এর পাশেই রেল লাইন ও তেজগাঁও বস্তি। এই তিনটি জায়গায় গড়ে ওঠেছে আরেক বাজার। ইয়াবার বাজার। প্রকাশ্যে ইয়াবার পাশপাশি এখানে অন্য মাদকও বিক্রি হয়। তবে অল্প পুঁিজতে বেশী চাহিদা থাকার কারনে ইয়াবাই বেঁচা বিক্রি হয় বেশী। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কাওরান বাজার বস্তি ও রেল লাইনের ত্রিশ, চল্লিশ জন কিশোরী। যাদের বয়স বারো থেকে আঠারোর নিচে। যদিও এর বাইরে আরো শতাধিক নারী জড়িত ইয়াবা ও মাদক বিক্রির সঙ্গে। একজন সাধারন পথযাত্রী হিসেবে যে কেউই কাওরান বাজার রেললাইন ধরে হাটলেই ডাক পড়বে এসব কিশোরীদের। যারা স্পর্শকাতর জায়গা ইয়বা রেখে ইয়াবা বিক্রি করে। পদযাত্রীদেরর দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা করে। সরেজমিনে কাওরানবাজার রেললাইনে গিয়ে মিলে এমন দৃশ্য।
এদিকে তেজগাঁও বস্তি ,কাওরান বাজার, রেলগেইট ও ফার্মগেটের কিছু অংশে কিশোরীদের ঘুরে ঘুরে ইয়াবা ও গাজা বিক্রির দৃশ্য চোখে পড়ে। কিশোরীদের বাইরেও এইসব বিক্রি করছেন নারী সদস্যরা। কিশোরীদের মাদক বিক্রির এমন দৃশ্য সবার চোখে পড়লেও চোখে পড়ে না আইনশ্খৃলা বাহিনীর সদস্যদের। তারা বলছেন আগে মাদক বিক্রি হলেও এখন আর এসব বিক্রি হয় না। সরজমিনে মিলে উল্টো দৃশ্য। কাওরান বাজার এইচআরসি বিলডিংয়ের নিচে ও ওয়াসার নিচে এসব কিশোরীদের প্রকাশ্যে ইয়াবা ও গাজা বিক্রি দৃশ্য মিলে। তাছাড়া কাঁচা বাজারই একই দৃশ্য। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব কিশোরীরা বেশীর ভাগই তেজগাঁও বস্তির বাসিন্দা। তাছাড়া তারা অনেকেই থাকে রাস্তায়।
বর্তমানে কাওরান বাজার রেললাইনের পাশে ঝুপড়ি ঘরগুলো তেমন একটা না দেখা গেলেও এসব ঘরের জায়গায় ঝটলা বেঁধে এবং এর বাইরে বসে থাকে ইয়াবা বিক্রেতারা। তাদের মূল উদ্দেশ্য ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বিক্রি। তবে রেললাইনে পাশেও কিছু ঝুপড়ি ঘর রয়েছে। এসব ঝুপড়ি ঘর একেকটা ইয়াবার দোকানে পরিনত হয়েছে।গাঁজা থেকে শুরু করে ইয়াবা, ফেনসিডিল সব মাদকই এই বস্তিতে সহজলভ্য। এ বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ইয়াবা। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে গাঁজা এবং তৃতীয় অবস্থানে হেরোইন। তবে ফেনসিডিল প্রকাশ্যে না আনলেও চাহিদার আলোকে ঘর থেকে এনে দেয় বিক্রেতারা।
কাওরান বাজার এইচআরসি বিলডিংয়ের সামনে এক কিশোরী সঙ্গে কথা হয়। নাম বলতে অনিচ্ছুক ওই কিশোরী বলেন, কাওরান বাজার এলাকায় আমাদের মতো অনেক মেয়ে আছে যারা ইয়াবা বেঁচে, গাজা বেঁচে। কেন এসব বিক্রি করে এমন প্রশ্নে ওই কিশোরী বলেন , আমাদের কেউ কাজ দেয় না। পড়াশোনা নেই। যার কারনে পেটের দায়ে এসব বেঁচতে বাধ্য হই। প্রতিদিন আমি বিশ পচিশটি ইয়াবা বিক্রি করতে পারি । এতে ছয় সাত’শ লাভ হয়।
এদিকে এমন কয়েকজন কিশোরীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশীর ভাগ কিশোরীই পরিবার পরিজন নেই। রুটিরুজির একমাত্র অবলম্বন মাদক বিক্রি। তাদের অনেকইে আবার নিজেও আসক্ত হয় যায় এসব মাদকে। তবে তাদের বেঁচাবিক্রির ধরন একটু ভিন্ন। এসব কিশোরীদের মধ্যে নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করা থাকলেও যে যার ইচ্ছে মতো ঘুরে ঘুরে মাদক বিক্রি করতে পারে তারা। কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। তবে তাদের ভাষ্যে ইয়াবা বিক্রির লভাংশের একটি অংশ পুলিশ প্রতিদিন এসে নিয়ে যায়। তবে তেজগাঁও থানা পুলিশ বিষয়টি অস্বিকার করেন।
কাওরান বাজার ওয়াসা বিলডিংয়ের নিচে এক যুবকে ইয়াবা কিনতে দেখা গেছে। একটু এগিয়ে জিঙ্গেস করলে তিনি বলেন, বাবা কিনেছি, আপনার এত জানার দরকার কি? এসব বলে তিনি আর কথা বলতে চাননি। ইয়াবার দামধর সর্ম্পকে জানা গেছে, এই এলাকায় চার রকমের ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে গাঢ় লাল রঙের চম্পা প্রতি পিস ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়। হালকা গোলাপী রঙের সেভেন আপ ইয়াবার দাম সবচেয়ে বেশি। এটি ঢাকায় কমপক্ষে ৫০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। হালকা গোলাপী রঙের আরেক ধরনের ইয়াবার নাম জেপি। এর খুচরা মূল্য ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। ডগ নামের মাটি রঙের ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। এছাড়াও বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে দেশেই তৈরি হচ্ছে এক রকমের ভেজাল ইয়াবা। এগুলো ১৫০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে বিশেষ কোনো উপলক্ষ্যে প্রতিটি ইয়াবা ট্যাবলেটের খুচরা দাম ১ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। তবে এসব ইয়বায় তারা কিনেন তৃতীয় পক্ষ থেকে । যার ফলে লাভের পরিমান কম বলে তারা জানিয়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ইয়াবা মূলত আসে টেকনাফ থেকে। এসব চালানগুলো টেকনাফ থেকে চট্রগ্রাম হয়ে ট্রেনে করে রাজধানীতে আনা যায়। এসব কারণে কাওরান বাজারের রেলপথকে বেছে নিয়েছে মাদক বিক্রেতারা। পাশে শুঁটকির বাজারও মাদক ব্যবসায়ীদের আরেকটি বাড়তি সুবিধার কারণ। টেকনাফ থেকে শুঁটকির চালান এখানকার দোকানে আসে। এ চালানের ভেতরে করে ইয়াবার চালান আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, মাদক একটি জীবন শেষ করে দেয়। তার ওপর অপ্রাপ্ত বয়স্করা যখন মাকদ বেঁচাবিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পরে তাহলে পরিনাম হয় খুব ভংঙ্কর। তাদেরকে চিহ্নিত করে পূর্নাবাসন এবং কিশোর সংশোধনাগারে দেয়া উচিৎ।
তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাহ উদ্দিন মিয়া ইয়াবা বিক্রিয় বিষয়টি স্বিকার না করলেও অন্যান্য মাদক বিক্রির বিষয়টি স্বিকার করেন। তিনি বলেন কিশোরী ও কয়েকজন নারী গাজা বেঁচার তথ্য আছে আমাদের কাছে। তাদেরকে আমরা গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলেও আবার বের হয়ে তারা একই কাজে নেমে পড়েন। ইয়বার ব্যপারে তিনি বলেন,এই বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এখন আমরা খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নিবো।

দৈনিক কালের খবর নিয়মিত পড়ুন এবং বিজ্ঞাপন দিন..

কালের খবর মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com