শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ন
মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন, কালের খবর :
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং আগামীর রাষ্ট্র নির্মাণে যে নেতৃত্ব ধারাবাহিক ত্যাগ, দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, তাদের অবদান অস্বীকার করলে জাতীয় ইতিহাস যেমন বিকৃত হয়, তেমনি ভবিষ্যৎ পথচলাও গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে তাকালে তিনটি নাম ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং দেশনায়ক তারেক রহমান। এই তিনটি নাম কেবল ব্যক্তির পরিচয় নয়; বরং একটি জাতির টিকে থাকার সংগ্রাম, গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম এবং আধুনিক আগামীর প্রতিচ্ছবি। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনে ফিরে তাকাই এবং সামনে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলোর রেখা দেখি, তখন অনুভব করি—বাংলাদেশের রক্তকণিকায় মিশে আছে এই তিন ব্যক্তিত্বের আদর্শ ও ত্যাগ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল ক্ষমতার পালাবদলের বৃত্তে আবদ্ধ কোনো সাধারণ বিবরণ নয়; এটি মূলত রাষ্ট্র রক্ষা, সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ, জটিল ও আত্মত্যাগপূর্ণ সংগ্রামের দলিল। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশ নানা অভ্যন্তরীণ সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ, রাজনৈতিক বিভাজন ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার মুখোমুখি হয়েছে। এই প্রতিকূল বাস্তবতায় যে নেতৃত্বগুলো সবচেয়ে কার্যকরভাবে রাষ্ট্রকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা সম্পূর্ণ হতে পারে না। এই তিন প্রজন্মের নেতৃত্বই বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে তিনটি সুদৃঢ় স্তম্ভ হিসেবে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত।
শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে সাহসী ও বাস্তববাদী রাষ্ট্রনায়কদের একজন। একাত্তরের রণাঙ্গনে তার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল শুধু একটি সামরিক কৌশলগত বার্তা নয়; ছিল একটি দিশাহীন জাতির জন্য আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রীয় সত্তার সুস্পষ্ট ঘোষণা। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, দুর্ভিক্ষের ছায়া এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যেই তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই কঠিন সময়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে মতপ্রকাশ ও প্রতিযোগিতার পথ খুলে দেন, যা রাষ্ট্রকে একদলীয় শাসনের গহ্বর থেকে উদ্ধার করে।
জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” ধারণা ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি ছিল ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রদর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের শক্তি রাজধানীকেন্দ্রিক প্রশাসনে নয়, বরং গ্রামবাংলার কৃষক, শ্রমিক ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীর হাতে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন ও স্বনির্ভর অর্থনীতির যে দর্শন তিনি তুলে ধরেছিলেন, তা আজও বাংলাদেশের উন্নয়নচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মর্যাদাশীল অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার শাহাদাত কেবল একজন রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যু নয়; এটি ছিল একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রদর্শনের আকস্মিক ছেদ।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণ করা সহজ ছিল না। সেই কঠিন বাস্তবতায় দৃঢ় নেতৃত্ব নিয়ে সামনে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। সামরিক শাসন ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন প্রতিরোধের প্রতীক। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তার নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নির্ণায়ক বাঁক সৃষ্টি করে, যার মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতন ঘটে এবং গণতন্ত্র পুনরায় প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়।
রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি নির্বাচনব্যবস্থায় জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনেন, যা দীর্ঘ সময় ধরে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা সম্প্রসারণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও তার সরকারের অবদান বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য।
তবে বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ কেবল নীতিগত সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ নয়; তার ব্যক্তিগত জীবনও এই ত্যাগের নীরব সাক্ষ্য। দীর্ঘ কারাবরণ, গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও চিকিৎসা নিয়ে অবহেলা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়া—সবকিছুর পরও তিনি কখনো গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপস করেননি। ক্ষমতার মোহ নয়, বরং ভোটাধিকার ও জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নই ছিল তার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এ কারণেই তিনি কেবল একটি দলের নেত্রী নন; তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক স্থায়ী প্রতীক। গত ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৫-এ তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হারায়নি, হারিয়েছে তার পরম মমতাময়ী এক অভিভাবককে। তাঁর সেই শূন্যতা আজও এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে হাহাকার তৈরি করে। তিনি শিখিয়ে গেছেন—জীবন দেওয়া যায়, কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে আপোষ করা যায় না।
এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে বর্তমান সময়ে সামনে রয়েছেন জনাব তারেক রহমান। বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমানের রাজনীতিতে পথচলা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ২০০৭ সালের ১/১১-এর ষড়যন্ত্র থেকে শুরু করে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন—তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার কোনো চেষ্টাই বাকি রাখা হয়নি। কিন্তু ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি বিদেশের মাটিতে থেকেই হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের কোটি কোটি তরুণের আশার প্রদীপ।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিবাদ পতনের নেপথ্যে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা ছিল অনস্বীকার্য। প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি যেভাবে প্রতিটি কর্মীর সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন এবং আন্দোলনকে চাঙ্গা রেখেছেন, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। ২০২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর যখন তিনি বীরের বেশে বাংলাদেশে পা রাখলেন, তখন ঢাকাসহ গোটা দেশ যে জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল, তা প্রমাণ করে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে তাঁর আসন কত গভীরে।
দীর্ঘদিন প্রবাসে অবস্থান করলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার প্রভাব ও ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি রাজনীতিকে আবেগনির্ভর বক্তব্যের সীমা ছাড়িয়ে নীতি, পরিকল্পনা ও কাঠামোর জায়গা থেকে দেখতে চান। তার ঘোষিত “রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা” কর্মসূচি একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের সুস্পষ্ট নীতিগত রূপরেখা—যেখানে আইনের শাসন, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা একসূত্রে গাঁথা।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভবিষ্যতমুখিতা। তিনি তরুণ সমাজকে রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে আনতে চান এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনের মাধ্যমে সেবা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেন। দলীয় কাঠামোতে সংস্কার, নীতিনির্ভর রাজনীতি এবং গবেষণাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সমসাময়িক রাজনীতিতে একটি ভিন্ন অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মামলা, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক অপপ্রচারের শিকার হয়েও তিনি সহিংসতার পথ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর আস্থা রাখছেন, যা একটি পরিণত ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচায়ক।
জিয়া, খালেদা ও তারেক রহমান—এই তিন নেতৃত্বের মধ্যে একটি মৌলিক সাদৃশ্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। তারা ক্ষমতার চেয়ে রাষ্ট্রকে বড় করে দেখেছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের মর্যাদার প্রশ্নে তারা কখনো আপস করেননি। ফলে এই ধারাকে অস্বীকার করা মানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে অস্বীকার করা।
আজ বাংলাদেশ যখন গণতন্ত্রের সংকট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন, নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, তখন এই তিন স্তম্ভের আদর্শ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাদের ত্যাগের ইতিহাস কেবল স্মরণ করার বিষয় নয়; এটি আগামীর রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য একটি কার্যকর দিকনির্দেশনা।
বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে জিয়া–খালেদা–তারেক রহমান কেবল অতীতের চরিত্র নন; তারা ভবিষ্যতের দিকনকশা। যে জাতি তার ত্যাগী নেতৃত্বের আদর্শ ধারণ করে, সে জাতিই ইতিহাসের কঠিন বাঁক অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের স্বপ্ন আজও গভীরভাবে এই রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গেই যুক্ত।
জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বপ্নের বীজবপনকারী, খালেদা জিয়া ছিলেন সেই চারাগাছকে রক্ত-ঘাম দিয়ে বড় করা মালী, আর তারেক রহমান হচ্ছেন সেই বৃক্ষের সুফল ঘরে তোলার আধুনিক কারিগর। এই তিন প্রজন্মের আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের ইতিহাসই আজকের বাংলাদেশ। শহীদ জিয়ার অসমাপ্ত স্বপ্ন আর বেগম জিয়ার অপূর্ণ ইচ্ছাটুকু পূরণ করাই এখন তারেক রহমানের জীবনের মূল লক্ষ্য।২০২৬ সাল হোক সেই সূচনালগ্ন, যেখানে হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হবে, মানুষের মুখে হাসি ফুটবে এবং ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি আবারও ১৮ কোটি মানুষের হৃদস্পন্দনে পরিণত হবে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যারা জনগণের অধিকারের জন্য লড়েছে, তারা কখনো পরাজিত হয় না। জিয়া, খালেদা ও তারেকের আদর্শই হবে আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আলোকবর্তিকা।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
Email : msislam.sumon@gmail.com