শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন
সহিদুল ইসলাম সুমন, কালের খবর :
সত্তরের দশকের সেই ধুলোবালি মাখা দিনগুলোর কথা একবার কল্পনা করুন। একাত্তরের যুদ্ধের ক্ষত তখনো দগদগে, মাঠের পর মাঠ পড়ে আছে চৈত্রদিনের ফাটা মাটির মতো চৌচির হয়ে, আর মানুষের চোখেমুখে কেবলই দুমুঠো ভাতের অনিশ্চয়তা। চারদিকে এক ধরনের হাহাকার, এক বেলা খেলে অন্য বেলা কী জুটবে তা কেউ জানে না। ঠিক সেই সময়টায় একজন মানুষ ধীরপায়ে মঞ্চে এলেন, যার পরনে সাধারণ সাফারি আর চোখে এক অস্থির স্বপ্ন। তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি যখন উদাত্ত কণ্ঠে বললেন “উৎপাদন বাড়াও”, সেটা কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; ওটা ছিল দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একটা জাতির বেঁচে থাকার শেষ মন্ত্র।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুপারশপে গিয়ে প্লাস্টিকে মোড়ানো চাল কিনি কিংবা বিদেশের ডলার সংকটে কপালে ভাঁজ ফেলি, তখন জিয়ার সেই ‘স্বনির্ভরতার অর্থনীতি’ যেন আমাদের কানে এসে বারবার তর্জনী উঁচিয়ে কিছু একটা বলতে চায়। ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর, সে বারবার আমাদের ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতার হাল ধরলেন, তখন বাংলাদেশ মূলত দাতাদেশগুলোর দয়ার ওপর বেঁচে ছিল। আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলা হতো ‘বাস্কেট কেস’। জিয়ার দর্শনটা ছিল খুব সোজাসাপ্টা পরনির্ভরশীলতা এক ধরনের দাসত্ব। তিনি বুঝেছিলেন, যে জাতি নিজের খাবার নিজে জোগাড় করতে পারে না, তার স্বাধীনতার কোনো অর্থ নেই। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা যদি সারাক্ষণ অন্যের থলের দিকে তাকিয়ে থাকি, তবে আমাদের মেরুদণ্ড কোনোদিন সোজা হবে না।
আমি যখন পুরনো আর্কাইভের পাতাগুলো উল্টাই, তখন দেখি জিয়ার সেই বিখ্যাত ১৯-দফা কর্মসূচির কথা। এর প্রাণভোমরা ছিল কৃষি। তিনি শুধু ফাইলে সই করে ক্ষান্ত হননি, তিনি নেমে গিয়েছিলেন মাঠের কাদামাটিতে। সেই যে খাল খনন কর্মসূচি আজকের জেনারেশন হয়তো ভাববে এটা আবার এমন কী! কিন্তু তখনকার পরিবেশে সেটা ছিল এক নীরব বিপ্লব। হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে মাইলের পর মাইল খাল খনন করছে, মৃতপ্রায় নদীগুলোতে প্রাণ ফিরছে দৃশ্যটা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। এটা শুধু সেচের পানি পাওয়ার লড়াই ছিল না, এটা ছিল আলস্য ঝেড়ে ফেলে নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। তিনি চেয়েছিলেন প্রতিটি ইঞ্চি জমি যেন সবুজে ভরে ওঠে। জিয়ার সেই “সবুজ বিপ্লব” আমাদের শিখিয়েছিল যে, মাটির নিচেই বাংলাদেশের আসল ব্যাংক ব্যালেন্স লুকানো আছে।
জিয়াউর রহমান মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা নয়, বরং এর প্রকৃত রাজধানী হলো এর ৬৮ হাজার গ্রাম। আজ আমরা বড় বড় সেমিনারে বিকেন্দ্রীকরণের গালভরা কথা বলি, কিন্তু জিয়া সেটা সত্তর দশকেই হাতে-কলমে করে দেখিয়েছিলেন। তার ‘গ্রাম সরকার’ ধারণাটা ছিল এক অনন্য উদ্ভাবন। তিনি চেয়েছিলেন গ্রামের সমস্যা গ্রামেই সমাধান হোক। কৃষকের নালিশ শোনার জন্য তাকে যেন মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে জেলা শহরে বা ঢাকায় আসতে না হয়।
শহরমুখী হওয়ার যে একপাক্ষিক ঝোঁক আজ আমরা দেখছি, জিয়া তার উল্টো পথে হাঁটতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, গ্রামের মানুষের হাতে যদি টাকা থাকে, গ্রামে যদি কুটির শিল্প আর কৃষিভিত্তিক কলকারখানা গড়ে ওঠে, তবেই দেশটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াবে। তিনি যখন গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন, মানুষের সাথে কথা বলতেন, তখন কোনো প্রোটোকলের দেয়াল থাকত না। মাঝেমধ্যে দেখা যেত গভীর রাতে তিনি কোনো এক কৃষকের দাওয়ায় বসে মুড়ি খাচ্ছেন আর ফসলের খবর নিচ্ছেন। তার এই অদ্ভুত সংযোগটাই তাকে সাধারণ মানুষের পালস বুঝতে সাহায্য করেছিল। তিনি কৃষকদের জন্য ঋণ সহজ করলেন, সারের ব্যবস্থা করলেন আর গ্রামগুলোতে শিক্ষিত যুবকদের কৃষিতে আসার আহ্বান জানালেন। সেই সময়কার গ্রামগুলোতে এক ধরনের প্রাণের স্পন্দন ফিরে এসেছিল, মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল যে—হ্যাঁ, আমরাও পারি।
আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষত কোথায় জানেন? আমাদের সবকিছুই এখন আমদানি করতে হয়। ডাল থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল, এমনকি মাঝেমধ্যে কাঁচামরিচ বা পেঁয়াজ আসার জন্য আমাদের বিদেশের বন্দরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। জিয়াউর রহমান ঠিক এই জায়গাটাতেই ভয় পেতেন। তার দর্শন ছিল—বিদেশের ওপর অতিনির্ভরতা আমাদের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে দেয়। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশ হবে এক রফতানিমুখী দেশ।
জিয়ার সময়েই মূলত আজকের তৈরি পোশাক শিল্পের বীজ বপন করা হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন আমাদের শ্রম আর মেধা যেন বাইরে সস্তায় বিক্রি না হয়ে দেশের ভেতরেই পণ্য তৈরিতে কাজে লাগে। তিনি যখন দেশে বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খুললেন, তার উদ্দেশ্য কিন্তু দেশকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া ছিল না; বরং দেশি কাঁচামালকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেওয়া ছিল মূল লক্ষ্য। আজ যখন আমরা ডলারের অভাবে আমদানির এলসি খুলতে পারি না, যখন বাজারে জিনিসপত্রের দাম আগুনের মতো ছড়ায়, তখন জিয়ার সেই ‘স্বনির্ভর’ হওয়ার ডাকটা কত যে প্রাসঙ্গিক ছিল, তা হাড়হাড্ডিতে টের পাওয়া যায়। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক অর্থনীতি, যা বাইরের কোনো ধাক্কায় হুট করে ভেঙে পড়বে না।
জিয়াউর রহমান বুঝেছিলেন যে, কেবল বড় বড় হেভি ইন্ডাস্ট্রি দিয়ে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। তাই তিনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (SME) ওপর জোর দিয়েছিলেন। বিসিক (BSCIC) শিল্পনগরীগুলোকে তিনি নতুন করে প্রাণদান করেছিলেন। তার একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল যে, প্রতিটি থানায় ছোট ছোট ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে। গ্রামের শিক্ষিত বেকার ছেলেরা চাকরি না খুঁজে উদ্যোক্তা হবে।
নারীদের উন্নয়নের মূল ধারায় আনতে তিনি যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা আজ আমরা অনেকেই ভুলে গেছি। ঘরে ঘরে সেলাই মেশিন পৌঁছে দেওয়া কিংবা হস্তশিল্পের প্রসারে তার ভূমিকা ছিল অসামান্য। তিনি চেয়েছিলেন নারীরাও যেন উৎপাদনের অংশীদার হয়। আজ যে লাখ লাখ নারী গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ করছেন, এর প্রাথমিক ভিত্তিটা কিন্তু সেই কুটির শিল্পের বিপ্লব থেকেই শুরু হয়েছিল। তিনি সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করে বেসরকারি খাতের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করেছিলেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগের প্রতি তার এই অগাধ বিশ্বাসই আজকের বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি।
বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে একটা বড় ধরনের শূন্যতা চোখে পড়ে। আমরা উন্নয়নের অনেক বড় বড় অট্টালিকা বানিয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের কৃষি আর ক্ষুদ্র শিল্প কি আগের মতো শক্তিশালী আছে? জিয়ার সেই ‘উৎপাদন বাড়াও’ দর্শনের জায়গায় এখন যেন ‘আমদানি করো আর কমিশন খাও’—এই সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। এখন উৎপাদনকারীর চেয়ে দালালের কদর বেশি।
আজ বাজারে গেলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। কেন? কারণ আমাদের উৎপাদনের চেয়ে চাহিদার ভারসাম্য নেই। আমরা ভোগবাদী হয়ে পড়েছি, কিন্তু উৎপাদনকারী হতে ভুলে গিয়েছি। আমরা এখন মেগা প্রজেক্টের চাকচিক্যে মুগ্ধ, কিন্তু শেকড়ের খবর রাখা ছেড়ে দিয়েছি। জিয়ার আমলে যে ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন ছিল, তা আজ যেন কেবল জাদুঘরের স্মৃতি। বর্তমানের রিজার্ভ সংকট কিংবা মূল্যস্ফীতির যে রাহুগ্রাস, তা থেকে মুক্তির উপায় কিন্তু সেই পুরনো পাঠেই লুকিয়ে আছে। আমাদের আবার মাটির কাছে ফিরতে হবে, আমাদের আবার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের শক্তি দিতে হবে। জিয়া যেমনটা বলতেন, “হাতে কাজ করো, উৎপাদন বাড়াও”—এই সহজ সত্যটা আমরা যত দ্রুত বুঝব, দেশের জন্য ততই মঙ্গল।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কয়েক দশক আগের এক নেতার দর্শন কি আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কাজে লাগবে? উত্তরটা হলো—অবশ্যই। প্রযুক্তির রূপ বদলাতে পারে, কিন্তু ক্ষুধার চরিত্র বদলায় না। যে মাটি আমাদের সোনার ফসল দেয়, সেই মাটিকে অবহেলা করে কোনো জাতি কোনোদিন টিকতে পারেনি। জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন এমন এক বাংলাদেশ, যে দেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তিনি বৈদেশিক সাহায্যের জন্য হাত পাতা দেশ থেকে বাংলাদেশকে একটি সাহায্য প্রদানকারী দেশে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখতেন।
তার আমলেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো চাল রফতানি করার সক্ষমতা অর্জন করেছিল। এটা কোনো ছোটখাটো অর্জন ছিল না। যে দেশ তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই দেশ থেকে চাল বাইরে যাচ্ছে—এটা ছিল বাঙালির এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। তিনি চেয়েছিলেন আমাদের প্রকৌশলীরা দেশের বাঁধ বানাবে, আমাদের শ্রমিকরা দেশের সম্পদ তৈরি করবে। এই যে আত্মমর্যাদাবোধ, এটাই ছিল জিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
জিয়াউর রহমান কোনো জাদুকর ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন এক কঠোর পরিশ্রমী বাস্তুবাদী। তার উন্নয়ন দর্শন ছিল অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গভীর। তিনি জানতেন, একটা দেশ তখনই বড় হয় যখন তার সাধারণ মানুষ স্বাবলম্বী হয়। আজ হয়তো সময় পাল্টেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সবখানে, কিন্তু মানুষের খিদের লড়াই আর দেশের টিকে থাকার লড়াইটা এখনো সেই একই রকম আছে।
আমি যখন এই লেখাটা শেষ করছি, তখন মনে হচ্ছে—আমাদের হয়তো আবার সেই খাল খননের উদ্যমে নামতে হবে। তবে এবার হয়তো কোদাল দিয়ে নয়, আধুনিক নীতি আর দেশপ্রেমের শক্তি দিয়ে। জিয়ার স্বনির্ভরতার অর্থনীতি আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, অন্যের দয়ার দান বা ঋণের বোঝা কোনো জাতির জন্য গৌরবজনক নয়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মধ্যেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন মানে কেবল বড় রাস্তা বা ফ্লাইওভার নয়; উন্নয়ন মানে হলো প্রতিটি মানুষের ঘরে ভাতের নিশ্চয়তা আর পকেটে উপার্জনের অর্থ।
শহীদ জিয়ার সেই উৎপাদনমুখী চিন্তাভাবনা যদি আমরা আবার বুকে লালন করতে পারি, তবেই হয়তো এই দেশ প্রকৃত অর্থে এক স্বনির্ভর সোনার বাংলায় পরিণত হবে। নতুবা আমদানির দাপটে আর ঋণের ভারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেরুদণ্ড বাঁকা হয়েই থাকবে। সময় এসেছে আবার সেই মাটির কাছে ফেরার, আবার সেই “উৎপাদন বাড়াও” মন্ত্রে উজ্জীবিত হওয়ার।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
Email : msislam.sumon@gmail.com