শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
রাঙ্গামাটি জেলার দুর্গম সাজেক ইউনিয়নে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ। কালের খবর নওগাঁ-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী সামসুজোহা খানের পক্ষে প্রচারণা। কালের খবর ঢাকা ১৭ আসনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কমিটির সমন্বয়ক ডাবলু ও যুগ্ম সমন্বয়ক রাজ। কালের খবর লক্ষ্মীপুরে গণ মিছিলে এসে জামায়াত – বিএনপির ২ কর্মীর মৃ-ত্যু। কালের খবর সবার আগে বাংলাদেশ : একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্জন্ম ও আগামীর রাষ্ট্র দর্শন। কালের খবর নবীনগরে অস্ত্রসহ একজন আটক, শিশুকে মুচলেকায় মুক্ত৷। কালের খবর ফেসবুকে ফেক স্ট্রাইক : মুফতি আমির হামজার ভেরিফাইড পেজ অপসারণ, সাইবার হামলার অভিযোগ। কালের খবর নবীনগরে ১১ দলের জনসভায় : মিডিয়াকে চরিত্র বদলের আহবান জানিয়ে মিডিয়ার মালিকদেরকে ‘প্রথম মোনাফিক’ আখ্যায়িত করলেন এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। কালের খবর খাগড়াছড়ি : পাহাড়ের অর্থনীতিতে পর্যটনের নতুন দিগন্ত ও আগামীর পথরেখা। কালের খবর লক্ষ্মীপুর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত। কালের খবর
ঘরোয়া জীবন থেকে রাজপথের অগ্নিকন্যা : বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে হয়ে উঠেছিলেন আপোষহীন দেশনেত্রী। কালের খবর

ঘরোয়া জীবন থেকে রাজপথের অগ্নিকন্যা : বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে হয়ে উঠেছিলেন আপোষহীন দেশনেত্রী। কালের খবর

 

।। শাহেনা আক্তার, কালের খবর।। 

রাজনীতি এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা।এখানে কেউ আসেন বংশ পরম্পরায়, কেউ আসেন দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পথ বেয়ে, কেউ আসেন কেবল নিয়তির টানে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বেগম খালেদা জিয়া নিয়তির টানে উদিত হলেও, তিনি হলেন সেই বিরল ব্যক্তি যাকে সময়ের দাবী আর জাতির এক ক্রান্তিলগ্ন ঘর থেকে টেনে রাজপথে নিয়ে এসেছিল। একজন মিতভাষী গৃহবধূ থেকে কীভাবে তিনি এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ‘ একগুঁয়ে’ বা জনগণের ভাষায় ‘ আপোষহীন’ নেত্রী হয়ে উঠলেন সেই গল্প কোন সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়।
১৯৮১ সালের সেই রক্তঝরা ৩০শে মে’র কথা চিন্তা করুন! চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সেই বিষাদময় সকালটি কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ককে কেড়ে নেয়নি বরং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) এক বিশাল মরুভূমির মাঝখানে ফেলে দিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর চারদিকে যখন ঘোর অন্ধকার আর অনিশ্চয়তা, তখন দলের নেতাকর্মীরা হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন এমন একটা নাম যা সবাইকে এক সুতায় বাঁধতে পারবে। ঠিক সেই মুহুর্তে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন এক নারী!কালো চশমায় ঢাকা চোখ, চাদরে জড়ানো শরীর, শান্ত কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক ব্যক্তিত্ব! তিনিই বেগম খালেদা জিয়া! এর আগে তিনি পরিচিত ছিলেন কেবল রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবে। অথচ সময়ের প্রয়োজনে তিনি যখন দলের হাল ধরলেন, তখন অনেকেই হয়তো আড়ালে মুচকি হেসেছিলেন। ভেবেছিলেন এই সাধারণ নারী রাজনীতির কুটিল জটিল চালের সামনে কতক্ষণই বা টিকে থাকবেন! কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন আপাত শান্ত সাগরের নীচেও বিশাল ঢেউ লুকিয়ে থাকে!
বেগম খালেদা জিয়ার ‘আপোষহীন’ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল ৮০’র দশকের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০— এই দীর্ঘ ৯ টি বছর ছিল তাঁর জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা! যখন সেনাশাসক এরশাদের বুটের তলায় পিষ্ট হচ্ছিলো বাংলাদেশের গণতন্ত্র,তখন অনেক বড় বড় নেতা, ঝানু রাজনীতিবিদ স্বৈরশাসকের সাথে আপোষ করে নির্বাচনে যাওয়ার বা ক্ষমতার ভাগ নেয়ার জন্য ফন্দি আঁটছিলেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন হিমালয়ের মতো অটল। তাঁকে বার বার গৃহবন্দী করা হয়েছে, বাসভবনে পুলিশি হানা দেয়া হয়েছে এমনকি নানা ভয় ও প্রলোভনও দেখানো হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া তারঁ মুখে কোন কথা নাই! এই একরোখা জেদ, এটাই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘ দেশনেত্রী’ বানিয়ে দিয়েছিল। তিনি যখন গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য মিছিলে শরীক হতেন,তখন সাধারণ মানুষ মনে করতো যে তাদের সাথে এক খাঁটি দেশপ্রেমিক লড়াই করছেন। রাজপথের সেই তপ্ত পিচ আর পুলিশের লাঠিপেটা তাকে বিন্ধুমাত্র টলাতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধাঁ তাকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলেছিল। তিনি আসলে নিজের জন্য নয়, বরং এই দেশের মানুষের ভোটাধিকার ফেরানোর জন্য এক জেদি লড়াই চালিয়ে গেছেন দিনের পর দিন।
১৯৯১ সাল! দেশ এক নতুন দিগন্তের অপেক্ষায়! স্বৈরাচার পতনের পর যখন প্রথম মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন হলো, তখন অনেক বিশ্লেষকের ভবিষ্যৎ বানীকে মিথ্যা প্রমাণ করে সাধারণ জনগণ এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে! সেই বিপ্লবের নাম ভোট বিপ্লব এবং সেই বিপ্লবীর নাম ‘বেগম খালেদা জিয়া’। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যখন শপথ নেন, সেটা কেবল তার ব্যক্তিগত জয় ছিল না, বরং তা ছিল এদেশের সাধারণ মানুষের জয়, নারীদের জয়। তিনি ক্ষমতার চেয়ারে বসে ভুলে যাননি তার শেকড়ের কথা। তাঁর শাসনের প্রথম মেয়াদে নারী শিক্ষা প্রসারে দশম শ্রেনী পর্যন্ত মেয়েদের লেখাপড়া ফ্রি করার পাশাপাশি উপবৃত্তির ব্যবস্থা করা- এই একটি সিদ্ধান্ত আমাদের সমাজকে বদলে দিয়েছে। আজ আমরা যখন দেখি অজপাড়া গাঁয়ের একটি মেয়ে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি অফিসে বড় বড় পদে চাকরি করছে, বিমান চালাচ্ছে তার গোড়াপত্তনটা বেগম খালেদা জিয়া’ই করেছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে সবসময়ই কঠোর ছিলেন। দেশের সার্বভৌমত্বের উপর কোন আঘাত এলে তিনি বিন্ধুমাত্র ছাড় দেননি। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর যে অবস্থান, তা আজও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বিশেষ করে পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাতিলের জন্য লংমার্চ, সীমান্তে আগ্রাসন ও হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সবখানেই তাঁর কন্ঠ ছিল বজ্রকঠিন। তিনি জানতেন, পরাক্রমশালী প্রতিবেশি বা অন্য কোন শক্তির কাছে মাথানত মানেই হলো দেশের স্বার্থ ও আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেয়া। আর তাই তো আন্তর্জাতিক অংগনেও তিনি বাংলাদেশের অবস্থান উঁচু করে রেখেছিলেন। তাঁর আমলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল, অবকাঠামো উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল যা আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মানে মূল ভুমিকা রেখেছিল।
রাজনীতির পথ কখনো সহজ নয়। আর বেগম খালেদা জিয়ার জন্য তা ছিল আরও বন্ধুর! ২০০১ সালের নির্বাচনে বিশাল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও তাঁকে নানামুখী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা কর‍তে হয়েছে। তবে তার চরিত্রের আপোষহীনতার আসল রূপ দেশবাসী দেখতে পেয়েছিল ২০০৭ সালের ওয়াল ইলেভেনের সময়। তত্বাবধায়ক সরকার যখন ‘ মাইনাস-টু’ ফর্মূলা নিয়ে মাঠে নামে, তখন অনেক রাজনৈতিক নেতা বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিলেন বা স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী ছিলেন, তখন খালেদা জিয়া অটল পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল সসম্মানে বিদেশে চলে যাওয়ার। কিন্তু তিনি উচ্চারণ করেছিলেন সেই ইস্পাত দৃঢ় সেই ঐতিহাসিক বাক্য —‘ দেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নেই, এই দেশেই আমার সব।’ জেল জুলুম, মামলা তাকে টলাতে পারে নি। দুই ছেলেকে কারান্তরীণ হতে দেখেছেন, তাঁদের ওপর অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেছেন, তবু কোন অন্যায্য শর্তে আপোষ করেন নি। এই যে শত নির্যাতনে, জুলুমের মুখেও মাথা উঁচু করে থাকা, এটাই তাকে সবার চেয়ে আলাদা করে রাখে, অন্যন্য মর্যাদায় নিয়ে যায়!
ব্যক্তিগত জীবনে বেগম খালেদা জিয়া কতটা শোক সহ্য করেছেন তা ভাবলে অবাক হতে হয়। স্বামী মারা গিয়েছেন অকালে, বড় ছেলে নির্বাসিত, ছোট ছেলের লাশ এসেছে বিদেশের মাটি থেকে! একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে যাতনার আর কি হতে পারে? সেই শোককেও তিনি পাথরের মত চেপে রেখেছিলেন নিজের ভিতরে। নিজের বসত বাড়ি থেকে এককাপড়ে টেনে হিঁচড়ে বের করে দেয়া হয়েছে। একাকী নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন জেলখানায়। নিজের দুখ:গুলোকে তিনি শক্তিতে পরিনত করেছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় যখন হাসপাতালে জীবন কাটিয়েছেন, মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখেছেন তখনো তাঁর ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব মানুষের মনে শ্রদ্ধা জাগায়।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন মানেই এক বিরামহীন সংগ্রামের নাম। তিনি যেমন রাজপথের নির্ভীক সিপাহসালার ছিলেন, তেমনি ছিলেন কোমল, কমনীয় নারী, মমতাময়ী মা! তিনি কখনো বিরোধী দলের প্রতি ঘৃণা ছড়ান নি, রাজনৈতিক সমালোচনা করেছেন। তিনি কখনো প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত বিষয়কে রাজনীতির মাঠে আনেন নি। তিনি ছিলেন কোমলে কঠোরে মিশানো এক বীরোচিত রাষ্ট্রপ্রধান!
শেষে বলতে হয়, সময় বড় বিচারক! সময় কেবল বিজয়ী বা বিজেতাদের ইতিহাস লিখে না বরং তাদের কথা লিখে রাখে যারা স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে গন্তব্যে পৌঁছানোর সাহস দেখায়। বেগম খালেদা জিয়া সময়ের সেই সাহসী মানুষ! বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ধ্রুবতারা জ্বলেছিলেন এবং জ্বলবেন। দেশের জন্য তাঁর আপোষহীন ভূমিকা কেবল তাঁর বা তাঁর রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়, বরং তা সমগ্র জাতির অমূল্য উত্তরাধিকার। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের গৌরভের প্রশ্নে তাঁর নাম শ্রদ্ধা আর সম্মানের সাথে উচ্চারিত হবেই। তিনি ছিলেন এই দেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে এক আদর্শিক নাম হয়ে, ভবিষ্যতেও থাকবেন আকাশের ধ্রুবতারা হয়ে দেশের ক্রান্তিলগ্নে পথ দেখাবেন সবসময়। তাঁর জীবনের অদম্য গতি ও আদর্শ, আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা যোগাবে, যে অনুপ্রেরণা মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়েও ফুল ফোঁটাবে ।

শাহেনা আক্তার
সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক, জেলা বিএনপি, খাগড়াছড়ি
সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী মহিলাদল,খাগড়াছড়ি জেলা

দৈনিক কালের খবর নিয়মিত পড়ুন এবং বিজ্ঞাপন দিন..

কালের খবর মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com