বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ১২:৩০ অপরাহ্ন
মো. সাহিদুল ইসলাম সুমন, কালের খবর :
মানুষ যখন কোনো উজ্জ্বল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন সে আসলে নিজের জগতটাকে সংকুচিত করে ফেলে। সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তহীন স্ক্রোলিংয়ের মধ্যে যে এক ধরণের সম্মোহন আছে, তা আমাদের তরুণদের চিন্তার গভীরতাকে গ্রাস করে ফেলছে। তারেক রহমান যে ‘নতুন বাংলাদেশ’ এর কথা বলছেন, সেখানে কেবল দালানকোঠা বা রাস্তার উন্নয়ন যথেষ্ট নয়, বরং আমাদের প্রয়োজন মানুষের মনের অবকাঠামো তৈরি করা। একটি রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো তার নাগরিকের মস্তিষ্ক, আর সেই মস্তিষ্ককে শাণিত করার একমাত্র কার্যকর অস্ত্র হলো বই। আজ যখন আমরা একটি জাতীয় পাঠ নীতি নিয়ে কথা বলছি, তখন আমাদের বুঝতে হবে এটি কেবল কিছু লাইব্রেরি তৈরির প্রকল্প নয়, বরং এটি একটি জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল। কারণ যে জাতি চিন্তা করতে ভুলে যায়, তারা খুব সহজেই অপপ্রচার আর সস্তা আবেগের শিকারে পরিণত হয়। আমাদের এই প্রস্তাবিত নীতির প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য হতে হবে পড়ার অভ্যাসকে একটি বিলাসিতা থেকে বের করে এনে নাগরিকের মৌলিক অভ্যাসে রূপান্তর করা। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে, সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি আমাদের জাতীয় উৎপাদনশীলতাকে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন করছে। একজন তরুণ যখন দিনে পাঁচ ঘণ্টা টিকটক বা ফেসবুকে কাটান, তখন তিনি আসলে সৃজনশীল কাজ থেকে নিজেকে বিচ্যুত রাখছেন। এই বিপুল শ্রমঘণ্টার অপচয় ঠেকাতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি সুসংগত কাঠামোর প্রয়োজন। প্রস্তাবিত এই নীতিমালার মূলে থাকবে শিক্ষা ব্যবস্থায় বই পড়ার একীভূতকরণ। বর্তমানে আমাদের জিপিএ-কেন্দ্রিক যে শিক্ষা ব্যবস্থা, তা একজন শিক্ষার্থীকে কেবল মুখস্থ করতে শেখায়, তাকে জগত ও জীবন নিয়ে ভাবতে শেখায় না। তাই প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পাঠ্যবইয়ের বাইরে কমপক্ষে তিনটি সৃজনশীল বা জ্ঞানমূলক বই পাঠ করা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। তবে এটি যেন কোনোভাবেই পরীক্ষার বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়, বরং এটি হতে হবে আনন্দদায়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে একটি দিন থাকবে ‘বই আলোচনার দিন’, যেখানে কোনো শিক্ষক নয়, বরং শিক্ষার্থীরাই তাদের পড়া বই নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক ও মতবিনিময় করবে।
তারেক রহমানের আগামীর রাষ্ট্র দর্শনে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। এই অন্তর্ভুক্তি তখনই সম্ভব হবে যখন জ্ঞানের আলো কেবল শহরের শিক্ষিত শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ না থেকে গ্রাম-বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাবে। আমাদের দেশে জেলা পর্যায়ের পাঠাগারগুলোর অবস্থা আজ বেশ নাজুক। এই জাতীয় পাঠ নীতির আওতায় প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি করে ‘স্মার্ট লার্নিং সেন্টার’ বা আধুনিক পাঠাগার স্থাপন করতে হবে। এই কেন্দ্রগুলো কেবল বইয়ের গুদাম হবে না, বরং এখানে দ্রুতগতির ইন্টারনেট থাকবে যেন তরুণরা ই-বুক এবং আন্তর্জাতিক জার্নালগুলো পড়তে পারে। আমাদের প্রকাশনা শিল্পের দিকে তাকালে দেখা যায়, কাগজের দাম এবং অন্যান্য করের কারণে বইয়ের দাম আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হলে বইয়ের ওপর থেকে সমস্ত ধরণের আমদানি শুল্ক ও কর পুরোপুরি তুলে নিতে হবে। এমনকি প্রকাশকদের জন্য বিশেষ ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখা দরকার যেন তারা সুলভ মূল্যে বই বাজারে ছাড়তে পারেন। আসলে আমরা যদি আজ কাগজের দামে ছাড় না দেই, তবে ভবিষ্যতে আমাদের মূর্খতার জন্য অনেক বেশি চড়া মূল্য দিতে হবে। এমনিভাবে আমাদের জাতীয় বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেবল ‘বই ক্রয়’ খাতের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে, যা দিয়ে রাষ্ট্র প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে বই কিনে দেশের প্রতিটি গ্রাম ও শহরের পাঠাগারগুলোতে সরবরাহ করবে। এটি প্রকাশনা শিল্পকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি বইয়ের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করবে।
সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি কমানোর জন্য কেবল আইন দিয়ে কাজ হবে না, বরং আমাদের একটি শক্তিশালী বিকল্প সংস্কৃতি দাঁড় করাতে হবে। তারেক রহমান বারবার যে মেধাভিত্তিক রাজনীতির কথা বলেন, তার মূলে রয়েছে স্বচ্ছ ও স্বাধীন চিন্তার মানুষ তৈরি করা। প্রস্তাবিত নীতি অনুযায়ী, প্রতিটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি দপ্তরে ছোট পরিসরে হলেও একটি পাঠাগার থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। কর্মীদের কর্মঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট পড়ার জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে। এটি কেবল তাদের মানসিক প্রশান্তি দেবে না, বরং তাদের কর্মদক্ষতাও বাড়িয়ে তুলবে। আমরা যদি উন্নত বিশ্বের দিকে তাকাই, তবে দেখব যে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা তাদের সাফল্যের পেছনে বই পড়ার অবদানকে সবচেয়ে বড় মনে করেন। আমাদের দেশেও এই সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে হবে। আর এই যাত্রায় প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়াটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে। একটি জাতীয় ‘বই অ্যাপ’ তৈরি করা যেতে পারে যেখানে বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী বইগুলো এবং গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদগুলো বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ থাকবে। অডিও বুকের প্রসার ঘটানো গেলে যারা দীর্ঘ সময় যাতায়াতে ব্যয় করেন, তারা কান পেতে জ্ঞানের স্বাদ নিতে পারবেন। ডিজিটাল আসক্তি দূর করতে হলে তরুণদের হাতে এমন কিছু দিতে হবে যা স্ক্রিনের চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর। বই সেই রোমাঞ্চ দিতে পারে যদি আমরা তাকে সঠিক উপায়ে উপস্থাপন করি।
তারেক রহমানের ‘নতুন বাংলাদেশ’ এর যে সামাজিক চুক্তি, তাতে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানের অনেক বাবা-মা সন্তানদের শান্ত রাখতে তাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেন। এটি বিষের মতো কাজ করছে। জাতীয় পাঠ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে হবে ‘প্যারেন্টিং গাইডেন্স’ বা অভিভাবকদের সচেতনতা কর্মসূচি। শিশুদের হাতে ফোন নয়, বরং রঙিন গল্পের বই তুলে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচারণা চালাতে হবে। এমনকি শিশু জন্মের পর যখন তার জন্মনিবন্ধন করা হয়, তখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি ‘বেবি বুক কিট’ উপহার দেওয়ার প্রথা চালু করা যেতে পারে। এটি একটি প্রতীকী কাজ হলেও এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এমনিভাবে তরুণদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরিতে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ও ইনফ্লুয়েন্সারদের কাজে লাগানো যেতে পারে। তারা যদি দামী ব্র্যান্ডের প্রচার না করে একটি ভালো বইয়ের রিভিউ দেন, তবে তা তরুণদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। মেধাভিত্তিক এই রাষ্ট্র গঠনের লড়াইয়ে আমাদের শিক্ষকদের মর্যাদাও বাড়াতে হবে। একজন শিক্ষক যখন নিজে বই পড়বেন, তখনই তিনি তার ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতে পারবেন। তাই শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ‘বুক অ্যালাউন্স’ বা বই কেনা ভাতা চালুর প্রস্তাবও এই নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা সমীচীন।
বৌদ্ধিক বিকাশের এই আন্দোলনে লেখক ও অনুবাদকদের অবদান অনস্বীকার্য। আমাদের দেশে লেখকরা কেবল রয়্যালটির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে পারেন না। এই প্রতিকূলতা দূর করতে ‘জাতীয় লেখক ফান্ড’ গঠন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং সমাজচিন্তা নিয়ে কাজ করেন, তাদের গবেষণার জন্য দীর্ঘমেয়াদী স্কলারশিপের ব্যবস্থা করতে হবে। তারেক রহমানের আগামীর বাংলাদেশে কোনো লেখক যেন অর্থাভাবে তার কলম থামিয়ে না দেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সাথে বিদেশি ভাষার গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো দ্রুত বাংলায় অনুবাদের জন্য একটি শক্তিশালী অনুবাদ কেন্দ্র স্থাপন করা দরকার। বিশ্বের চলমান পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে হলে আমাদের তরুণদের গ্লোবাল নলেজ বা বৈশ্বিক জ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে হবে। অনুবাদ সাহিত্য আমাদের চিন্তা জগতকে প্রসারিত করবে এবং কূপমণ্ডূকতা থেকে মুক্ত রাখবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যে বিষবাষ্প আজ ঘৃণা আর গুজব ছড়াচ্ছে, তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঢাল হলো ইতিহাস ও দর্শনের বই। মানুষ যখন ইতিহাস জানে, তখন তাকে সস্তা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা দিয়ে বিভ্রান্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আমাদের জাতীয় পাঠ নীতিতে ইতিহাসের নির্মোহ পাঠকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের আরেকটি দিক হলো ডিজিটাল স্বাস্থ্যের সাথে অর্থনীতির সম্পর্ক। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যে সকল দেশে তরুণদের মধ্যে বই পড়ার হার বেশি, সেখানে উদ্ভাবনী স্টার্টআপ এবং পেটেন্ট রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যাও বেশি। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা কেবল সোশ্যাল মিডিয়ার ভোক্তা হিসেবে রেখে দেই, তবে আমরা আসলে বড় বড় বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ডাটা-সার্ভেন্ট বা তথ্যের দাসে পরিণত হচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এই তরুণদের উদ্ভাবক হিসেবে গড়ে তোলা। আর উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজন নিবিড় মনোযোগ বা ‘ডিপ ফোকাস’, যা কেবল বই পড়ার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। প্রস্তাবিত নীতিমালায় তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এমন একটি শর্ত রাখা যেতে পারে যে, তারা যদি তাদের কর্মক্ষেত্রে জ্ঞানের চর্চা বজায় রাখেন, তবে তারা বিশেষ ইনসেনটিভ বা কর সুবিধা পাবেন। এটি ব্যবসায়িক পরিবেশকেও মানবিক ও জ্ঞাননির্ভর করে তুলবে। তারেক রহমানের রাষ্ট্র দর্শন কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আহ্বান। এই বিপ্লবের কেন্দ্রে থাকবে বই। আমরা যখন একটি জাতীয় বইমেলা করি, তখন সেটি কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর ধরে পালাক্রমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহরে ছড়িয়ে দিতে হবে। এই মেলাগুলো হবে মিলনমেলা, যেখানে লেখক ও পাঠকের সরাসরি সংযোগ ঘটবে।
সবশেষে বলা যায়, এই খসড়া জাতীয় পাঠ নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তারেক রহমানের নেতৃত্বে যখন দেশ এক নতুন ভোরের দিকে এগোবে, তখন আমাদের প্রতিটি ঘরে একটি ছোট হলেও লাইব্রেরি থাকতে হবে। আমরা যদি আজ আমাদের সন্তানদের বইমুখী করতে না পারি, তবে আগামীর বাংলাদেশ হবে মেধাহীন এবং মেরুদণ্ডহীন। সোশ্যাল মিডিয়ার মায়াজাল ছিন্ন করে বইয়ের গাম্ভীর্যে ফিরে আসাটাই এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় জিহাদ। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে রাষ্ট্রকে কেবল হুকুমদাতা নয়, বরং সহায়তাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। বই পড়ার মাধ্যমে যে বিচারবুদ্ধি তৈরি হয়, তাই হবে আগামীর বাংলাদেশের রক্ষাকবচ। আমরা যেন ভুলে না যাই, একটি শক্তিশালী লাইব্রেরি একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর চেয়েও বেশি নিরাপত্তা দিতে পারে যদি সেই জাতি জানে কীভাবে জ্ঞানের শক্তি ব্যবহার করতে হয়। আসুন, আমরা মেকি জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে প্রকৃত প্রজ্ঞার সন্ধান করি। এই প্রস্তাবিত জাতীয় পাঠ নীতি কেবল একটি দলিল নয়, এটি আমাদের আগামীর স্বপ্নের এক নকশা। যেখানে প্রতিটি তরুণ হবে একেকজন চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া, যারা তাদের জ্ঞান দিয়ে বিশ্বকে বদলে দেবে এবং তারেক রহমানের স্বপ্নের সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ বাস্তবে রূপ দান করবে।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com