শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
রাঙ্গামাটি জেলার দুর্গম সাজেক ইউনিয়নে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ। কালের খবর নওগাঁ-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী সামসুজোহা খানের পক্ষে প্রচারণা। কালের খবর ঢাকা ১৭ আসনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কমিটির সমন্বয়ক ডাবলু ও যুগ্ম সমন্বয়ক রাজ। কালের খবর লক্ষ্মীপুরে গণ মিছিলে এসে জামায়াত – বিএনপির ২ কর্মীর মৃ-ত্যু। কালের খবর সবার আগে বাংলাদেশ : একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্জন্ম ও আগামীর রাষ্ট্র দর্শন। কালের খবর নবীনগরে অস্ত্রসহ একজন আটক, শিশুকে মুচলেকায় মুক্ত৷। কালের খবর ফেসবুকে ফেক স্ট্রাইক : মুফতি আমির হামজার ভেরিফাইড পেজ অপসারণ, সাইবার হামলার অভিযোগ। কালের খবর নবীনগরে ১১ দলের জনসভায় : মিডিয়াকে চরিত্র বদলের আহবান জানিয়ে মিডিয়ার মালিকদেরকে ‘প্রথম মোনাফিক’ আখ্যায়িত করলেন এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। কালের খবর খাগড়াছড়ি : পাহাড়ের অর্থনীতিতে পর্যটনের নতুন দিগন্ত ও আগামীর পথরেখা। কালের খবর লক্ষ্মীপুর ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত। কালের খবর
সবার আগে বাংলাদেশ : এক নদী রক্ত ও অশ্রুর পরে আগামীর এক পশলা স্বপ্ন। কালের খবর

সবার আগে বাংলাদেশ : এক নদী রক্ত ও অশ্রুর পরে আগামীর এক পশলা স্বপ্ন। কালের খবর

 

।। মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন, কালের খবর।।

বাংলাদেশ কোনো কেবল মানচিত্রের নাম নয়, বাংলাদেশ ২০ কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন ও আত্মপরিচয়ের নাম। কিন্তু বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই স্পন্দন যেন রুদ্ধ হয়ে এসেছিল। আমাদের নদীগুলো শুকিয়েছে, আমাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা হয়েছে এবং আমাদের জাতীয় পরিচয়কে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের শিকলে বন্দি করা হয়েছিল। আজ ২০২৬ সালের এই নতুন ভোরে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন দেখি কেবল লুণ্ঠন, বিচারহীনতা আর হাহাকারের ইতিহাস। এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যে দৃপ্ত ঘোষণা দিয়েছে— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—তা কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি এবং আগামীর এক পশলা উজ্জ্বল স্বপ্ন।
১. দর্শনের শিকড়: শহীদ জিয়ার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ
‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই দর্শনের মূল নিহিত রয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর মধ্যে। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে যখন দেশ এক গভীর পরিচয় সংকটে ভুগছিল, তখন তিনি এই ভূখণ্ডের মাটির গন্ধ ও মানুষের আবেগ মিলিয়ে এক নতুন পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন, আমাদের প্রথম ও শেষ পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। বিএনপি আজ সেই দর্শনকেই আধুনিকায়ন করেছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যখনই জাতীয় স্বার্থকে বাদ দিয়ে দলীয় বা গোষ্ঠীস্বার্থকে বড় করে দেখা হয়েছে, তখনই দেশ পিছিয়ে পড়েছে। তাই আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপির প্রধান অঙ্গীকার হলো—ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে দেশ বড়।
২. ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতার অবসান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেয়। গত দেড় দশকে আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রীর হাতে অসীম ক্ষমতা থাকায় রাষ্ট্রীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে।
প্রস্তাবিত রাষ্ট্র মেরামত রূপরেখায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। যার মধ্যে অন্যতম হলো—একই ব্যক্তি টানা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এটি বাংলাদেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের চিরস্থায়ী অবসান ঘটাবে। এর ফলে নেতৃত্বে স্থবিরতা আসবে না এবং নতুন প্রজন্মের মেধাবী নেতৃত্বের পথ সুগম হবে। এছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে, যাতে সংসদ কেবল রবার স্ট্যাম্পে পরিণত না হয়।
৩. অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ
বিগত বছরগুলোতে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার’ দেখেছে দেশবাসী। বিএনপি এই সংকটের সমাধান হিসেবে ‘দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা’র প্রস্তাব করেছে। আমাদের জাতীয় সংসদে একটি ‘উচ্চকক্ষ’ থাকবে, যেখানে দেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ ও বিভিন্ন পেশার বিজ্ঞ ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত হবেন। রাজনৈতিক ডামাডোলে অনেক সময় মেধাবীরা আড়ালে পড়ে যান; এই ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে তাদের মেধা ও অভিজ্ঞতা সরাসরি কাজে লাগানো যাবে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধার কোনো বিকল্প নেই।
৪. বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার
যে দেশে বিচার নেই, সে দেশে মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। অতীতের শাসকরা বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের যন্ত্র হিসেবে। আয়নাঘর আর গুমের সংস্কৃতির সেই বিভীষিকা আমরা ভুলিনি। বিএনপি অঙ্গীকার করেছে, নিম্ন আদালতকে আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করা হবে।
বিচারক নিয়োগে দলীয়করণের পরিবর্তে একটি স্বচ্ছ ‘জুডিশিয়াল কমিশন’ গঠন করা হবে। বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন না হয়, তবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কথাটি কেবল কাগুজে বুলি হয়ে থাকবে। আমাদের লক্ষ্য হলো—দেশের সাধারণ মানুষ যেন আদালতে এসে বলতে পারে, ‘আমি ন্যায়বিচার পাবই’।
৫. লুণ্ঠনমুক্ত অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের মুক্তি
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘লুটেরা পুঁজিবাদ’ বা ক্রোনি ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসেছিল। মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, অথচ সাধারণ মানুষের পাতে ভাত জোটেনি। মুদ্রাস্ফীতির যন্ত্রণায় পিষ্ট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের দীর্ঘশ্বাস আজ আকাশে-বাতাসে।
বিএনপির আগামীর অর্থনীতি হবে ‘উৎপাদনমুখী ও সুষম বণ্টনের অর্থনীতি’। আমরা একটি শক্তিশালী ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করব। পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংক লুটপাটকারীদের বিচারের আওতায় আনা হবে আমাদের প্রথম কাজ। এছাড়া, শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য ‘বেকার ভাতা’র প্রবর্তন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তাদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনা হবে। মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (SME) প্রণোদনা দিয়ে আমরা গ্রামীন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করব।
৬. পররাষ্ট্রনীতি: সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন হিমালয়
আমরা কারও সাথে বৈরিতা চাই না, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমরা হিমালয়ের মতো অটল। অতীতে আমরা দেখেছি কীভাবে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে আমাদের সীমান্ত রক্তাক্ত হয়েছে, আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হবে—‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে নয়’।
প্রতিটি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আঞ্চলিক সংযোগের (Connectivity) ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ’ থাকবে সবার উপরে। আমরা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব—কারও করুণা প্রার্থী হয়ে নয়, বরং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে। সার্ক (SAARC)-কে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
৭. সুশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
দুর্নীতি একটি ক্যানসারের মতো সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে। বিএনপি তার পরিকল্পনায় ‘লোকপাল’ (Ombudsman) নিয়োগের কথা বলেছে। সরকারি প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) প্রকৃত অর্থেই একটি স্বাধীন বাঘে পরিণত করা হবে, যারা প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সবার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারবে।
৮. তরুণ প্রজন্ম ও তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব
আজকের তরুণরা কেবল স্বপ্ন দেখতে চায় না, তারা স্বপ্নের বাস্তবায়ন চায়। তারা ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে কোনো শিকল চায় না, তারা চায় ফ্রিল্যান্সিং ও উদ্ভাবনের অবাধ সুযোগ। বিএনপি তরুণদের জন্য ‘নলেজ সিটি’ ও ‘আইটি পার্ক’ গড়ে তুলবে। ইন্টারনেটের দাম কমিয়ে প্রতিটি গ্রামে উচ্চগতির নেটওয়ার্ক পৌঁছে দেওয়া হবে। আমরা এমন এক প্রজন্ম গড়তে চাই যারা কেবল শ্রম দেবে না, বরং মেধাশক্তি দিয়ে বিশ্ববাজার দখল করবে।
৯. মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
সংবাদপত্র হলো গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। অতীতের শাসকরা কালো আইন দিয়ে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেছিলেন। বিএনপি ঘোষণা করেছে, ক্ষমতায় গেলে সকল কালো আইন বাতিল করা হবে। সংবাদমাধ্যম হবে রাষ্ট্রের দর্পণ। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে।

প্রিয় দেশবাসী, অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত কাছে আসে। আমরা অনেক রক্ত দিয়েছি, অনেক জুলুম সহ্য করেছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিনাবিচারে কারারুদ্ধ রাখা হয়েছিল, দেশনায়ক তারেক রহমানকে নির্বাসনে থাকতে হয়েছে—এই ত্যাগ কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং এই দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির জন্য।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই মূলমন্ত্রকে বুকে ধারণ করে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের একটাই পরিচয় হোক—আমরা বাংলাদেশি। বিএনপির এই রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা কোনো নির্বাচনী কৌশল নয়, এটি এক জননীর চোখের জল মোছানোর প্রতিশ্রুতি, এটি এক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার এবং এটি এক শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের গ্যারান্টি।
শহীদ জিয়ার স্বপ্নের সেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত হবে—সেই লক্ষ্যেই আমাদের পথচলা। আসুন, আমরা গড়ি আগামীর সেই বাংলাদেশ, যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের আর অগ্রাধিকার হবে কেবলই ‘বাংলাদেশ’।বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
Email : msislam.sumon@gmail.com

দৈনিক কালের খবর নিয়মিত পড়ুন এবং বিজ্ঞাপন দিন..

কালের খবর মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com