মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:৩০ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
বগুড়া সরকারি রাস্তা অবৈধভাবে দখল করছেন ভূমিদস্যুরা। কালের খবর নাসিরনগরে জোরপূর্বক মালিকানা জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ। কালের খবর গর্ভধারিণী মাকে খুঁজতে দেওয়ালে দেওয়ালে মায়ের সন্ধান চেয়ে পোস্টারিং। কালের খবর মাদক কারবারে সাংবাদিক, পুলিশ, বিত্তবানরাও জড়িত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কালের খবর চট্রগ্রামের বায়েজিদে ভূমিদস্যুদের হুমকিতে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অসহায় ইকবাল। কালের খবর রাস্তার উপর সাপ্তাহিক হাট, ভোগান্তি চরমে। কালের খবর নোয়াখালী স্কুল ছাত্রী লোমহর্ষক হত্যার বিচারের দাবীতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত। কালের খবর দৃষ্টি প্রতিবন্ধি কুরআনের হাফেজ মাওলানা মোঃ সাজিদুল ইসলাম বাঁচতে চায়। কালের খবর ডেমরায় চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় অতিষ্ঠ এলাকাবাসি থানা পুলিশ নীরব। কালের খবর ব্লাঙ্ক চেক স্ট্যাম্প জালিয়াতি ও মিথ্যা মামলায় হয়রানির প্রতিবাদে প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন। কালের খবর
নরসিংদীর রায়পুরায় পুলিশ বেপরোয়া আতঙ্কে চরাঞ্চলের মানুষ

নরসিংদীর রায়পুরায় পুলিশ বেপরোয়া আতঙ্কে চরাঞ্চলের মানুষ

 

 

কালের খবর প্রতিবেদন :

গত ২৬ জানুয়ারি রাতে মালয়েশিয়াপ্রবাসী সোহেল মিয়া একটি ভাড়া করা গাড়িতে চার স্বজনের সঙ্গে ঢাকা থেকে নিজ বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার হাইরমারা ইউনিয়নে ফিরছিলেন। গাড়িটি নরসিংদীর সদর উপজেলার সাহেপ্রতাব এলাকায় বিএল সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেওয়ার জন্য থামে।

তখন একটি মাইক্রোবাস থেকে নেমে সাতজনের একটি দল নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে বলে, সোহেলের গাড়িতে অবৈধ মালামাল রয়েছে। তারা তল্লাশির নামে সোহেলের কাছ থেকে দুটি স্বর্ণের বার, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোনসেটসহ প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টাকার মালামাল হাতিয়ে নেয়। এ ঘটনায় প্রবাসী সোহেলের স্বজন শাহজাহান মিয়া বিষয়টি লিখিতভাবে অভিযোগ করেন নরসিংদীর জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে। গোয়েন্দা পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে সিএনজি স্টেশনের সিসি টিভির ফুটেজ পরীক্ষা করে দেখে রায়পুরা থানার দুই উপপরিদর্শক (এসআই) শাখাওয়াত ও আজাহারুলসহ সাতজন অভিযানটি চালিয়েছিল। ৩০ জানুয়ারি শাহজাহান মিয়া সদর মডেল থানায় মামলা করেন। দুই এসআই এবং কনস্টেবল মাইনুল ইসলাম, সাইদুল ইসলাম, গাড়িচালক নুরুজ্জামান মোল্লাসহ সাতজন এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এখন জেলে আছে।

নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায়ই পুলিশ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে বলে একের পর এক অভিযোগ উঠছে। এ প্রতিনিধি সম্প্রতি সরেজমিনে রায়পুরার মির্জারচর ইউনিয়ন ঘুরে দেখেছেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ অনেকে পুলিশের ভয়ে রীতিমতো আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। গত ১৭ মার্চ ‘পুলিশ ধরে নেওয়ার পর ছয় নেতা নিখোঁজ’ শিরোনামে উপজেলার বাঁশগাড়ী ও নিলক্ষা ইউনিয়নের ছয় আওয়ামী লীগ নেতাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গুম এবং চার নেতাকে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করার সংবাদ কালের খবর প্রকাশ করে।

আতঙ্কে থাকা রায়পুরার চলাঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষ এখন ধীরে ধীরে মুখ খুলছে। অভিযোগ উঠেছে, এলাকায় পুলিশ নিজেই দল বেঁধে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েছে এবং রায়পুরা থানার ওসি দেলোয়ার হোসেন আসার পর পুলিশ এখন আরো বেপরোয়া।
মির্জারচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি জাফর ইকবাল মানিক। কালের খবরকে তিনি বলেন, সম্প্রতি ওসি তাঁকে উপজেলা কার্যালয়ের সামনে থেকে ডেকে নিয়ে থানায় আটকে রাখেন এবং দুই লাখ টাকায় ছাড়া পান। তিনি বলেন, তিনি আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক সভা শেষে উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন থেকে নিচে নামতেই এসআই মো. আরফান বলেন, ‘আপনাকে ওসি সাহেব সালাম দিয়েছেন। ’ মানিক বলেন, ‘আরফানের মোটরসাইকেলে করেই থানায় যাই। ’ স্থানীয় এমপি রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু ওসিকে ফোন দিয়ে তাঁকে ছাড়তে বলেছিলেন বলেও জানান মানিক। তিনি বলেন, ‘আমি ইউপি চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা। আমার যদি এই অবস্থা হয়, সাধারণ মানুষের কী অবস্থা এইবার বুঝেন। ’

কালের খবর’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুলিশের হাতে গুম বা পঙ্গু হওয়ার ভয় থেকে মির্জারচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোস্তফা, সিনিয়র সহসভাপতি লিল মিয়া প্রধান, কৃষক লীগের ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি হাজি জজ মিয়া, ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি লুৎফর রহমান, ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শাকিল আহমেদ ডানাসহ সরকার সমর্থক অনেক নেতাই পুলিশের ভয়ে এলাকা ছেড়েছেন। এলাকাছাড়া হওয়া নেতাদের অভিযোগ, পুলিশ বিএনপি নেতা মো. মাইনউদ্দিনের হয় কাজই শুধু করছে না, তাঁর চাচাতো ভাই মনা মিয়ার বাড়িতে অস্থায়ী ক্যাম্পও বসিয়েছে।

পাড়াতলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মো জাকির হোসেন বলেন, ‘বাঁশগাড়ী ও নিলক্ষা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতাদের গুম-খুনের ঘটনায় চরাঞ্চলে পুলিশ আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ’ ২৩ মার্চ ব্রেইনস্ট্রোক করে মারা যান বাঁশগাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হাফিজুর রহমান শাহেদ সরকার। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে কালের খবরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বাঁশগাড়ী আর নিলক্ষা ইউনিয়নের নেতাদের গুম ও পঙ্গুর ঘটনার পর আশপাশের ইউনিয়নের নেতারাও আতঙ্কে আছেন।

মির্জারচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘পুলিশের ভয়ে আমি নিজেও কয়েক মাস ধরে এলাকায় থাকি না। ’ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কোনো নেতা ইউনিয়নে পাওয়া যাবে না। ’

তল্লাশি বাণিজ্যের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এসআই সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নিলক্ষ্যা ইউনিয়নের হরিপুর, দরিপুর, শুঁটকিকান্দা ও গোপীনাথপুর গ্রামের ৪৯ জন গরুর ব্যাপারীর গরুসহ দুটি ট্রলার আটক করে এসআই সাখাওয়াত হোসেনসহ পুলিশের প্রায় ২০ সদস্যের দল। গরু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সেদিন প্রায় ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল পুলিশ। এরপর ব্যাপারীদের সন্ত্রাসী অভিযুক্ত করে মামলা দিয়ে আদালতে চালান দেয় পুলিশ। ব্যাপারীরা ১৩ দিন জেল খেটে জামিনে ছাড়া পান। নিলক্ষা ইউনিয়নের মো. জবা মেম্বার বলেন, সেদিন গরুর ব্যাপারীদের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা রিকভারি দেখানো হলেও পুলিশ হাতিয়ে নেয় ৭০ লাখ টাকা।

গরু ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেদিন দরিগাঁও গ্রামের হক মিয়ার কাছ থেকে পুলিশ এক লাখ ২৫ হাজার টাকা নিলেও চালানে রিকভারি দেখায় ৪৫ হাজার টাকা, ব্যাপারী বাবুল মিয়ার কাছ থেকে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা লুটে নিলেও চালানে দেখায় ১৬ হাজার টাকা, মোগল মিয়ার কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা নিলেও চালানে দেখায় ৪০ হাজার টাকা। এভাবে কালু মিয়ার এক লাখ ৯০ হাজার, ফেলু মিয়ার দুই লাখ ৬০ হাজার, করিম মিয়ার দুই লাখ ২০ হাজার, জলিল মিয়ার দুই লাখ ৪০ হাজার, কাশেম মিয়ার এক লাখ ৬০ হাজার, খলিল মিয়ার এক লাখ ৯০ হাজার টাকা লুটে নেয় বলে তাঁদের অভিযোগ।

অভিযোগ প্রসঙ্গে রায়পুরা থানার ওসি দেলোয়ার হোসেন কালের খবরকে বলেন, ‘পুলিশ কাউকে এলাকাছাড়া করেনি, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়। আর যেসব পুলিশ অপরাধ করেছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এখন কারাগারে আছে। ’ এর বেশি তিনি কথা বলতে চাননি।

নরসিংদী জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি-সার্কেল) মো. বেলাল হোসাইন কালের খবরকে বলেন, ‘মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যই মির্জারচর ইউনিয়নে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়েছে। কিন্তু বিএনপি নেতার ভাইয়ের বাড়িতে ক্যাম্প বসানো হয়েছে কি না আমার জানা নেই। আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা থাকার কারণে হয়তো এলাকাছাড়া। ’ কিন্তু তাঁদের চেয়ে বেশি বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, সেই বিএনপির নেতারা এলাকায় সুন্দরভাবেই বসবাস করছেন কিভাবে? জবাবে বেলাল হোসেন বলেন, ‘এমনটি তো হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি আমার নলেজে নেই। আমি খোঁজ নিয়ে বিষয়টি দেখব। ’

মির্জারচর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাইনউদ্দিন বলেন, ‘পুলিশ আমার বাড়িতে নয়, তাহের আলীর ঘরে ক্যাম্প বসিয়েছে। তাতে আমাদের (বিএনপির) লাভ তো দেখি না। তারা নিজেরা গ্রুপিং আর মারামারি করে বলে পুলিশ ক্যাম্প বসিয়েছে। ’ জানা যায়, তাহের আলী মাইনউদ্দিনের চাচা।

কালের খবর -২৭/৩/ ১৮√

দৈনিক কালের খবর নিয়মিত পড়ুন এবং বিজ্ঞাপন দিন..

কালের খবর মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের একটি প্রতিষ্ঠান
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com