শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৯ অপরাহ্ন
হাসিব হুদা, কালের খবর :
মধ্যপ্রাচ্য বহুদিন ধরেই বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চলগুলোর একটি। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আবারও একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—এই সংঘাত কি কেবল আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্ব, নাকি এটি ধীরে ধীরে এমন এক ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক মাত্রা পেতে পারে?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনার শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শাহ সরকারের পতন ঘটে এবং ইরানে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময় থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। এরপর কয়েক দশক ধরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব দুই দেশকে একে অপরের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে ইরানের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক প্রভাবকে সীমিত করার চেষ্টা করছে।
তবে এই সংঘাতের গুরুত্ব শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক বিরোধেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা ইরানের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে প্রবাহিত। যদি এই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তাহলে প্রথম ধাক্কা লাগতে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে। তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করতে পারে, যা ইতিমধ্যে উচ্চ ঋণ ও ধীরগতির প্রবৃদ্ধির মধ্যে থাকা অনেক দেশের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূমিকাও এতে যুক্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান নিরাপত্তা শক্তি হিসেবে উপস্থিত রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীন এই অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। রাশিয়া সিরিয়ায় শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছে, আর চীন অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে। ফলে ইরানকে ঘিরে সংঘাত যদি বিস্তৃত হয়, তবে এটি কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ থাকবে না; বরং এটি বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকাও এই সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। ফলে এই দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করতে সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে এবং নতুন কৌশলগত জোট গড়ে তুলছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলকে একটি দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক বড় বৈশ্বিক সংঘাতই শুরু হয়েছে এমন পরিস্থিতি থেকে যেখানে একাধিক শক্তি একই সংকটে জড়িয়ে পড়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের জোট কাঠামো একটি আঞ্চলিক সংকটকে দ্রুত বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ দিয়েছিল। বর্তমান বিশ্বেও সামরিক জোট, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এমন একটি জটিল পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে একটি আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে আধুনিক বিশ্বে পূর্ণমাত্রার বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি অনেক রাষ্ট্রই এড়িয়ে চলতে চায়। পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা বড় শক্তিগুলোকে সরাসরি সংঘর্ষ থেকে অনেক সময় বিরত রাখে। কিন্তু তবুও আঞ্চলিক সংঘাত, প্রক্সি যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
এই বাস্তবতায় ইরান–আমেরিকা উত্তেজনা কেবল দুই দেশের দ্বন্দ্ব নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার একটি জটিল প্রতিফলন। প্রশ্ন হলো—মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা কি শেষ পর্যন্ত একটি সীমিত আঞ্চলিক সংকট হিসেবেই থাকবে, নাকি এটি ধীরে ধীরে এমন এক বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেবে যা ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতির নতুন অধ্যায় লিখে দিতে পারে।
লেখক : অর্থনীতি ও ভু-রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
E-mail: hasibhuda@gmail.com