ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি, কালের খবর :
‘দিনদুপুরে শত শত মানুষসহ স্ত্রী ও মায়ের সামনে মাদক বিক্রির অভিযোগে একজন মানুষকে মব সৃষ্টি করে বর্বরোচিত নির্যাতন করা হলো! অথচ ঘটনার দুই দিন পরও এলাকায় অপরাধীরা ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ কোনো ভূমিকাই নিচ্ছে না! এর পেছনে কি তাহলে কোনো মহলের হস্তক্ষেপ আছে?’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের নারুই বাজারে বৃহস্পতিবার দুপুরে মাদক ব্যবসা করার অভিযোগে সালিশ বৈঠকে হবি মিয়া (৪০) নামের ওই ব্যক্তিকে নির্যাতন করা হয়। গতকাল দুপুরে একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এভাবেই তাঁর মন্তব্য জানান।
শুধু এই প্রধান শিক্ষকই নন, আইনবহির্ভূত এই নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে এখন সর্বত্রই তুমুল সমালোচনা। এরই মধ্যে এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে।
ভুক্তভোগী হবি মিয়া নারুই ব্রাহ্মণহাতা গ্রামের মৃত রহমত মিয়ার ছেলে। তিনি এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পুলিশ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নারুই গ্রামকে মাদকমুক্ত করতে, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে এক বিচার সালিশ বৈঠক বসে। এতে এলাকার মাদক নির্মূল কমিটির নেতারাসহ শতাধিক লোক উপস্থিত ছিল।
ওই বৈঠকে এলাকায় মাদক ব্যবসা করার অভিযোগ এনে স্থানীয় হবি মিয়াকে হাজির করা হয়। এরপর তাঁর চোখ, হাত-পা বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানো হয়।
এ সময় তাঁর স্ত্রী ও মা সেখানে দাঁড়িয়ে কান্না করছিলেন।
নির্যাতনের ছয় মিনিটের একটি ভিডিও পরে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, স্থানীয় সরদারদের নির্দেশে হবির হাত-পা বেঁধে একজনের পর একজন লাঠি দিয়ে তাঁর তালুতে সজোরে আঘাত করছেন। সে সময় ভুক্তভোগী ব্যথায় আর্ত চিৎকার করতে থাকেন। সালিশে উপস্থিত শতাধিক মানুষ সেই দৃশ্য দেখতে থাকে, অনেকে মুঠোফোনে তার ভিডিও ধারণ করে রাখে।
এলাকার কয়েকজন জানায়, হবি এলাকার সব মাদক বিক্রেতার সরদার হিসেবে পরিচিত। সালিশ বৈঠকে স্থানীয় সরদার মোকাররম, মোহসিন, তাজু মিয়া, হানিফ মেম্বারসহ বেশ কয়েকজনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক হবি মিয়ার ওপর এ রকম নির্যাতন করা হয়। এ বিষয়ে মব সৃষ্টিকারী সরদারদের সঙ্গে বারবার চেষ্টা করেও কথা বলা যায়নি।
নির্যাতনের ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ওবায়দুর রহমান বাদল নামের স্থানীয় এক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন, ‘মাদক বিক্রেতাকে পিটিয়ে বেশ ভালো করেছে গ্রামবাসী। যারা পেটাচ্ছে তাদের সাধুবাদ জানাই। পুলিশ ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করলে, এভাবেই মাদক সমাজ থেকে দূর করতে হবে।’
অন্যদিকে মানিক হায়দার নামের একজন লিখেছেন, ‘কেউ অপরাধী হলে আইন অনুযায়ী তার শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামের সরদারের নামে জালেমরা অসহায় মানুষকে নির্যাতন করতে জানে ঠিকই, কিন্তু সঠিক বিচার করতে জানে না। এসব কথিত সরদারকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা উচিত।’
এ বিষয়ে নবীনগর থানার ওসি মোর্শেদ আলম চৌধুরী এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ফেসবুকের মাধ্যমে ঘটনাটি জানার পরপরই একজন এসআইকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছিলাম। ভিক্টিমকে উদ্ধারসহ মব সৃষ্টিকারী সংশ্লিষ্টদের ধরে নিয়ে আসতেও পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাস্থলে অভিযুক্তদের পাওয়া যায়নি।’
ওসি আরো জানান, কেউ আইনবহির্ভূতভাবে মাদক বিক্রেতা বা কোনো ব্যক্তিকেই প্রকাশ্যে এভাবে চোখ ও হাত-পা বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় পেটানোর মতো জঘন্য কাজ করতে পারে না।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) ওবায়দুর রহমান গতকাল দুপুরে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এরই মধ্যে পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রচণ্ড নির্যাতনের শিকার হবি মিয়া জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ বিষয়ে তাঁর (হবি) ভাবীর আজই থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা।’
তবে বিকেলে ওসি বলেন, ‘হবির ভাবী আজ দুপুরে একটি লিখিত এজাহার নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি স্বাক্ষর করতে পারেন না বিধায় কাল (রবিবার) শনাক্তকারীসহ থানায় আবারও আসবেন। তখন আমরা মামলাটি নিয়ে নেব।’ বিএনপিদলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫) অ্যাডভোকেট এম এ মান্নানের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে কয়েকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
অফিস : ৪৪-ক, অতিশ দীপঙ্কর রোড, মুগদা, ঢাকা । সম্পাদকীয় কার্যালয় : আরএস ভবন, ১২০/এ মতিঝিল, ঢাকা
মোবাইল : ০১৭৫৩-৫২৬৩৩৩ ই-মেইল : dainikkalerkhobor5@gmail.com
কারিগরি সহযোগিতায় ফ্লাস টেকনোলজি